নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত — ভুলে যাওয়া আগুনের প্রতীক

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত এমন এক নাম, যা আমাদের বুকের ভিতর নীরবে কাঁদে, আবার গর্বে আগুন জ্বালায়। আমরা বাঘা যতীনের নাম স্মরণ করি, তাঁর বীরত্ব, তাঁর যুদ্ধে অদম্য নেতৃত্বের কথা মনে রাখি; কিন্তু তাঁর পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যারা মৃত্যুর মুখে এগিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের স্মৃতি কথা কতটা রাখি? নেতৃত্ব যেমন ইতিহাস গড়ে, তেমনি নেতৃত্বকে রক্ত, ত্যাগ আর শেষ নিশ্বাস দিয়ে পূর্ণতা দেন সহযোদ্ধারা। তাই আজকের গল্প সেই ভুলে যাওয়া বীরের, যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন—স্বাধীনতা কারও একার লড়াই নয়।

নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত
নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত 

১৮৯২ সালে জন্ম ফরিদপুর জেলার খেয়ারডাঙ্গা গ্রামে। পিতা ললিত মোহন দাশগুপ্ত, বাড়ি মাদারিপুর শহরে। স্কুলের বেঞ্চে বসে পাঠশালা শেষ না হতেই ১৯১০ সালের দিকে নাম লেখান মাদারিপুর বিপ্লবী সমিতিতে। দেশ তখন দমবন্ধ ভার, স্বাধীনতার আশায় অন্ধকার আলোড়ন। ১৯১৩ সালে ফরিদপুর ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার, কারাবাস। মাত্র কয়েক বছরেই জেলের ভিতরের লোহা তাঁর ভিতরের আগুনকে আরও ধারালো করে তোলে। ১৯১৫ সালে জেল থেকে বেরিয়ে তিনি সরাসরি লক্ষ্য ঠিক করেন দেশদ্রোহী গোয়েন্দা নীরদ হালদারকে—গুলিতে শেষ করেন তাকে। স্বাধীনতার নামে, জাতির নিরাপত্তার নামে, নিজের জীবন বাজি রেখে।
বাঘা যতীনের সংস্পর্শে এলে তাঁর পৃথিবী বদলে যায়। তাঁর কাছে যুদ্ধ মানে দেশ; তলোয়ার, বন্দুক, বা পিস্তল নয়—দেশমাতৃকার জন্য নিজের নিঃশ্বাস পর্যন্ত উৎসর্গ করে দেওয়া। জার্মান জাহাজ ম্যাডেরিক থেকে অস্ত্র সংগ্রহ, গোপন বার্তা বহন, দল সাজানো—প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি প্রস্তুত হচ্ছিলেন সেই শেষ যুদ্ধের জন্য। ৭ই সেপ্টেম্বর ১৯১৫—গভীর রাতে মহলডিহার অস্থায়ী আস্তানা, পাশে বাঘা যতীন, চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, জ্যোতিষচন্দ্র পাল, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত—এবং নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত।
পরদিন নদী, খাল, বিল পাড়ি দিতে দিতে ৯ই সেপ্টেম্বর ভোরে পৌঁছলেন বুড়িবালামের তীরে। পুলিশের খবর পেয়েছিল আগেই। চারদিক ঘিরে ধরেছে ইংরেজ বাহিনী, নেতৃত্বে টেগার্ট, রাদারফোর্ড, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিলভি। একদিকে অসংখ্য সেনা, অন্যদিকে মাত্র পাঁচজন বিপ্লবী—পরিখার আড়ালে মাউজার হাতে দাঁড়িয়ে। শুরু হলো গুলি বৃষ্টি, শব্দে আকাশ ভরে উঠল। মনে হচ্ছিল একসাথে অনেক বন্দুক চলছে, অথচ ছিল মাত্র পাঁচজন। হঠাৎ এক ঝাঁক গুলি এসে লাগে চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরীর শরীরে—রক্তে ভিজে যাচ্ছে মাটি, আর তৃষ্ণায় ছটফট করছে শরীর। বাঘা যতীন তখন নিজের গুলিবিদ্ধ দেহটিকে উপেক্ষা করে সঙ্গীর শেষ কামনা পূরণে আত্মসমর্পণ করেন—শুধু এক গ্লাস জলের জন্য।
বাঘা যতীন
বাঘা যতীন
তারপর সকলকে গ্রেপ্তার। বাঘা যতীন পরের দিন হাসপাতালে মারা যান। আদালতের রায়ে মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত এবং নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তকে মৃত্যুদণ্ড; জ্যোতিষচন্দ্র পালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তারিখ ৩ ডিসেম্বর ১৯১৫। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার সময় তাঁদের মুখে হাসি—হ্যাঁ, হাসি। কারণ মৃত্যু তাঁদের কাছে শেষ নয়, স্বাধীনতার জন্য একটি দরজা মাত্র। এগিয়ে গেলেন, হাসিমুখে আলিঙ্গন করলেন মৃত্যু।
এই গল্প শুধু অতীত নয়, এটি আজও হৃদয় কাঁপায়—এক তরুণের, যে বইয়ের বদলে হাতে বন্দুক নিয়েছিল, নিজের জীবনকে অগ্নিশিখায় জ্বালিয়ে দিয়েছিল দেশের মুক্তির স্বপ্নে।
আজ যদি আমরা বাঘা যতীনের স্মৃতিতে মোম জ্বালাই, তবে পাশে আরেকটি দীপ জ্বলবে সেই বিস্মৃত বীরের নামে— নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত।
কারণ স্বাধীনতার ইতিহাস লিখতে গেলে বীরদের নামই যথেষ্ট নয়— সেই নামগুলোকেও মনে রাখা উচিত, যারা ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়নি, কিন্তু রক্ত দিয়ে জাতির ভোর এনেছিল। চোখ ভিজে যায়, বুক ভারী হয়ে ওঠে— জয় হোক দেশের সন্তানদের।
— লেখায়: প্রকাশ রায়

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ