বাঘা যতীনের নেতৃত্বে পরিচালিত বুড়িবালামের তীরে সেই খণ্ডযুদ্ধের কথা আমরা অনেকেই পড়েছি—হয়তো কারও মুখে শুনেছি। পাঁচজন বিপ্লবী বনাম শত শত সশস্ত্র ইংরেজ সেনা। যেন অসম্ভব এক লড়াই, অথচ তাতে জয় ছিল সাহসের, আত্মত্যাগের, আর অদম্য দেশপ্রেমের। সেই পাঁচজনের একজন ছিলেন এক তরুণ যোদ্ধা, যিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত স্বাধীনতার নামে হাসতে হাসতে মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন—মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত।
![]() |
| মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত |
১৮৯৮ সালে জন্ম মাদারিপুর সদর উপজেলার খৈয়ারভাঙ্গা গ্রামে। পিতা হলধর সেনগুপ্ত, বড় ভাই প্রফুল্ল সেনগুপ্ত ছিলেন স্থানীয় হাই স্কুলের শিক্ষক। অতি অল্প বয়সেই মনোরঞ্জন দেশকে ভালোবেসে পথ খুঁজে পান জীবনের—গোপন বিপ্লব। পূর্ণচন্দ্র দাসের পরিচালিত ব্রতী সমিতি, পরে মাদারিপুর সমিতি—সেখানে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ সদস্য। লাঠি, শড়কি, ছোরা, তলোয়ার—সব অস্ত্রেই ছিলেন সিদ্ধহস্ত। পড়াশোনার খাতা বদলে গেল মাওজার পিস্তলে, আর মন ভরে উঠল স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতিতে।
১৯১৫ সালে তাঁকে পাঠানো হয় এক জীবনবাজি মিশনে—উড়িষ্যার বালেশ্বর উপকূলে জার্মান জাহাজ “ম্যাভেরিক” থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করার কাজে। তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাংলার নায়ক, বাঘা যতীন। ষড়যন্ত্র, পাহারা, রাতের অন্ধকারে নদী পার হওয়া, গোপন বার্তা, প্রবল তল্লাশি—সব সামলে ৭ই সেপ্টেম্বর মহলডিহার অস্থায়ী আশ্রয়ে একত্র হলেন পাঁচজন বিপ্লবী: যতীন মুখার্জী, চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, জ্যোতিষচন্দ্র পাল, নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত এবং মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত।
সারা রাত পায়ে হেঁটে, নদী-খাল-বিল পেরিয়ে পৌঁছলেন ৯ই সেপ্টেম্বর ভোরবেলায় বুড়িবালাম নদীর তীরে। পুলিশের কাছে খবর ততক্ষনে পৌঁছে গেছে; চারদিক থেকে ছুটে আসছে ইংরেজ বাহিনী। দুই ভাগে বিভক্ত পুলিশ, নেতৃত্বে টেগার্ট, কমান্ডার রাদারফোর্ড, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিলভি—আর বিপরীতে সেই পাঁচজন বিপ্লবী, পরিখার আড়ালে, হাতে মাউজার।
শুরু হলো গুলি বর্ষণ—এমন ভাবে পাঁচজন গুলি চালাচ্ছেন, যেন বারো জন অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে। বীরত্বে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। কিন্তু হঠাৎ চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরীর গায়ে এসে লাগে এক ঝাঁক গুলি, তিনি আহত। তৃষ্ণায় ছটফট করছিলেন, বাঘা যতীন তখন নিজের গুলিবিদ্ধ শরীরের যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে শুধু সঙ্গীর তৃষ্ণা মেটাতে ইংরেজদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন—এক গ্লাস জল পেতে।
পরিস্থিতি ধীরে ধীরে অসম্ভব হয়ে ওঠে। গুলিতে জর্জরিত দেহ নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন চিত্তপ্রিয়। গ্রেপ্তার করা হয় সবাইকে। বাঘা যতীন পরের দিন হাসপাতালে মারা যান। আর অনন্ত অপেক্ষা—ব্রিটিশ আদালতের রায়।
![]() |
| বাঘা যতীন |
১৯১৫ সালের ১৬ই অক্টোবর রায় ঘোষণা হল—মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত ও নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তকে মৃত্যুদণ্ড, জ্যোতিষচন্দ্র পালের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তারপর সেই দিন—৩রা ডিসেম্বর। ফাঁসির মঞ্চে উঠছেন দুই তরুণ—হাসিমুখে। চোখে কোনো ভয় নেই, কোনো অনুশোচনা নেই; আছে কেবল মন ভরা গর্ব, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গের শান্তি। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন তাঁরা, যেন এটি কোনো সমাপ্তি নয়—একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
আজ, যখন আমরা স্বাধীনতার কথা বলি, যখন আমরা শিরে ত্রিবর্ণের পতাকা তুলে ধরি, তখন আমাদের মনে পড়া উচিত সেই ভুলে যাওয়া নামগুলো—যারা বুক ভরা আগুন নিয়ে একদিন বন্দুক হাতে দাঁড়িয়েছিল স্বপ্নের ভারতের জন্য। তাদের হাসিতে, রক্তে, জীবনদানে, ইতিহাস হয়ে ওঠে পূর্ণ।
মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত—যে তরুণ হাসিমুখে মৃত্যুকে জয় করেছিলেন। তার নাম স্মরণ করলেই বুক ভারী হয়ে ওঠে, চোখ ভিজে আসে, আর মনে হয়— স্বাধীনতা কোনো কাগজের ইতিহাস নয়, এটা রক্তের লেখা উপন্যাস। জয় হোক ত্যাগের। জয় হোক বীরের।
— লেখায়: প্রকাশ রায়


0 মন্তব্যসমূহ