"একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি।"
আজও গ্রাম বাংলার পথে প্রান্তরে কোন উদাসী ভিক্ষুক হয়তো একতারাতে বিষণ্নতার সুর তুলে এই গানটি গেয়ে থাকেন। এই গানটির সাথে ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের এক মহান বিপ্লবীর নাম যুক্ত হয়ে আছে। তোমরা সবাই জানো, তিনি হলেন কিশোর ক্ষুদিরাম বসু। ১৮৮৯ সালের ৩রা ডিসেম্বর সবে মাত্র সূর্য অস্ত গেছে। ঘড়ির কাঁটা পৌঁছে গেছে পাঁচটার ঘরে। মেদিনীপুর শহরের কাছে হাবিবপুর গ্রামে। সেই গ্রামে বসু পরিবারের সকলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন। নবজাতকের কান্নার রোল শোনা যাচ্ছে। ছুটে এলেন গৃহকর্তা নবজাতকের পিতা ত্রিলোক্যনাথ বসু। পুত্র সন্তানের আগমন , ওহ হ্যাঁ এই নবজাতকের নাম হলো ক্ষুদিরাম। তার মাতার নাম ছিল লক্ষ্মীপ্রিয় দেবী। তিন কন্যার পর ক্ষুদিরাম তার মায়ের চতুর্থ সন্তান। তার দুই পুত্র অকালে মৃত্যুবরণ করেন। অপর পুত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি তখনকার সমাজের নিয়ম অনুযায়ী তার পুত্রকে তার বড়ো দিদির কাছে তিন মুঠো খুদের (চালের খুদ) বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে কেনা হয়েছিল বলে শিশুটির নাম পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম রাখা হয়।
![]() |
| ক্ষুদিরাম বসু |
ক্ষুদিরামের বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর তখন তিনি তার মাকে হারান। এক বছর পর তার পিতার মৃত্যু হয়। তখন তার বড়ো দিদি অপরূপা তাকে দাসপুর থানার এক গ্রামে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। অপরূপার স্বামী অমৃতলাল রায় ক্ষুদিরামকে তমলুকের হ্যামিল্টন হাই স্কুলএ ভরতি করে দেন। পরে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষালাভ করেন। ১৯০২ এবং ১৯০৩ সালে শ্রী অরবিন্দ এবং সিস্টার-নিবেদিতা মেদিনীপুর ভ্রমণ করেন। তারা স্বাধীনতার জন্যে জনসমক্ষে ধারাবাহিক বক্তব্য রাখেন এবং বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে গোপন অধিবেশন করেন, তখন কিশোর ছাত্র ক্ষুদিরাম এই সমস্ত বিপ্লবী আলোচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। স্পষ্টভাবেই তিনি অনুশীলন সমিতিতে যোগদান করেন এবং কলকাতায় বারীন্দ্র কুমার ঘোষের কর্মতৎপরতার সংস্পর্শে আসেন। তিনি ১৫ বছর বয়সেই অনুশীলন সমিতির একজন স্বেচ্ছাসেবী হয়ে ওঠেন এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসন বিরোধী পুস্তিকা বিতরণের অপরাধে গ্রেপ্তার হন। ১৬ বছর বয়সে ক্ষুদিরাম থানার কাছে বোমা মজুত করতে থাকেন এবং সরকারি আধিকারিকদেরকে আক্রমণের লক্ষ্য স্থির করেন ১৯০৪ সালে ক্ষুদিরাম তার বোন অপরূপার স্বামী অমৃতলাল রায়ের সঙ্গে তমলুক শহর থেকে মেদিনীপুরে চলে আসেন।
ক্ষুদিরাম একসময় শরীরচর্চার দিকে বিশেষ নজর দেন। গ্রাম থেকে গ্রামান্তর যাবার জন্য দ্রুতগামী রণপা ব্যবহার করতেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন , ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে অস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে। শুধু সংগ্রহ করলেই চলবে না। সেই অস্ত্র চালানোর কৌশলটাও শিখতে হবে। তখন মেদিনীপুরে বেশ কয়েকটি গুপ্ত সমিতি স্থাপিত হয়। একটি গুপ্ত সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রাজনারয়ণ বসুর ভ্রাতুষ্পুত্র জ্ঞানেন্দ্র বসু ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু। আর ছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগো। ক্ষুদিরাম শেষ পর্যন্ত হেমচন্দ্রকে চোখের সামনে দেখলেন। হেমচন্দ্র বুঝতে পারলেন, ক্ষুদিরামের ভিতর জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ আছে। ক্ষুদিরাম হেমচন্দ্রের কাছ একটা রিভলবার ছেয়েছিলেন। রিভলবার দিয়ে ব্রিটিশ মারতে হবে একথাই বলেছিলেন। এভাবেই হয়তো ভবিষ্যতের গুরু ও শিষ্যের মিলন ঘটে গেলো। হেমচন্দ্র বুঝতে পারলেন , ওই আগুনের শিখাটিকে ঠিক মতো প্রশিক্ষিত করতে পারলে, একদিন সে মহাপ্রলয় ঘটিয়ে দেবে।
ক্ষুদিরাম এই সময় সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সংস্পর্শে আসেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন একজন বিশিষ্ট বিপ্লবী সংগঠক। তিনি গ্রাম বাংলার পথে প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে তরুণ যুবক দের সংগ্রহ করতেন। তিনি বুঝতে পারলেন ক্ষুদিরাম কে দিয়ে তার স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ হবে। কংসাবতীর ওপারে ঘন জঙ্গলের মধ্যে একটি শিবের মন্দির আছে। ক্ষুদিরাম সেখানে বেশ কয়েকদিন পরে থাকলেন, আর তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন , যেন এই মাতৃভূমি ইংরেজদের কবল থেকে মুক্তি পায়। ক্ষুদিরামের এই কথা শুনে সকলেই অবাক হয়ে গেছিলেন। চারদিকে বিষাক্ত সাপেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবুও ক্ষুদিরাম ধ্যানমগ্ন হয়ে আছেন। সেখানে এসে হাজির হলেন বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তিনি বুঝতে পারলেন ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণটি এসে গেছে। এই সময়টির জন্যই অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। তারপর তিনি ক্ষুদিরামের চোখে চোখ রাখলেন, বিপ্লব মন্ত্রে দীক্ষা দেবার আগে ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞাসা করলেন দেশের জন্য জীবন দিতে পারবিতো?
ক্ষুদিরাম দ্বিধাশুন্য ভাবে জবাব দিলেন -- পারব বই কি। এই ছোট্ট কয়টি কথার মধ্যেই ক্ষুদিরামের দেশের জন্য মমতা ও তেজস্বীতার প্রমাণ মেলে। এরপর থেকেই তিনি সাধারণ বাঙালির জীবনযাপন ত্যাগ করে এক বিদ্রোহীর জিবন বরণ করে নেন। ক্ষুদিরামের স্বপ্ন সফল হলো। শুরু হলো তার জীবনের নতুন উপন্যাসের অধ্যায়। তিনি পরিণত হলেন গুপ্ত সমিতির এক সক্রিয় কর্মীতে। তারপর দিন কাটলো প্রচন্ড কর্মচাঞ্চল্যতার মধ্য দিয়ে। তখন ক্ষুদিরামের ওপর গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাকে মেদিনীপুর থেকে তমলুক যাতায়াত করতে হতো। দিনের বেলা গেলে পুলিসের নজরে পড়ে যাবেন, তাই রাতে সমস্ত পথ পায়ে হেঁটে চলে যান। শেষ অব্দি ক্ষুদিরামের এই পথ ভ্রমণের কথা পুলিসের কানে পৌঁছে যায়। যার কারণে তাকে সর্তক হতে হয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গদেশ দ্বিখণ্ডিত করা হলো। সর্বত্র প্রতিবাদে ফেটে পরলো মানুষ। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ক্ষুদিরাম এই আন্দোলনে এক মহান সৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯০৬ সালের মেদিনীপুর জেলখানার প্রাঙ্গণে কৃষি ও শিল্পমেলার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে "সোনার বাংলা" নানে একটি প্রচারপত্র বিলি করেন। পুলিসের নজরে আসলে, ক্ষুদিরাম পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
ক্ষুদিরামকে তখন বেশকিছুদিন আত্মগোপন করে থাকতে হয়। শেষ অব্দি বিপ্লবী দলের পরামর্শে ক্ষুদিরাম ধরা দিলেন। তার বিরুদ্ধে রাজদ্রহিতার অভিযোগ আনা হয়। বলা হয় তিনি সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ক্ষুদিরাম প্রথমদিকে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে চাননি। তবে তাকে আইনজীবীদের পরামর্শ শুনতে হয়। কিন্তু ক্ষুদিরাম মুক্তি পান। ক্ষুদিরামের মুক্তিতে সমস্ত শহর জুড়ে বিজয় উৎসব শুরু হয়। গুপ্ত সমিতির কাজে অরবিন্দ ঘোষ সেই সময় মেদিনীপুরে আসেন। তিনি নিজে ক্ষুদিরাম কে বুকে টেনে আশির্বাদ করলেন। এর পরের ঘটনা আমরা সকলেই জানি। ক্ষুদিরামকে পাঠানো হলো কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য। অত্যাচারী কিংসফোর্ডকে হত্যা না করলে বিপ্লবীদের স্বপ্ন সফল হবে না। ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকি ছদ্মবেশে মজফফরপুর পৌঁছলেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এলো সেই শুভ মুহূর্তের দিন। ৩০ এপ্রিল ১৯০৮ সাল একটি ফিটন গাড়িকে কিংসফোর্ড এর গাড়ি মনে করে তার ওপর বোমা নিক্ষেপ করেন। কিন্তু ভুল বশত মারা যান মিসেস ও মিস কেনেডি। প্রফুল্ল চাকী ধরা পড়ার আগে আত্মহত্যা করেন ও ক্ষুদিরাম শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যান।
![]() |
| ক্ষুদিরাম বসু |
ক্ষুদিরামের ওপর শুরু হলো বিচারের নামে প্রহসন। বিচারে তার ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়, শেষে ১১ ই আগস্ট ১৯০৮ সাল ফাঁসির মঞ্চে তোলা হলো ক্ষুদিরামকে। শেষবারের মতো ক্ষুদিরাম বললেন -- বন্দেমাতরম। চতুর্দিকে প্রতিধ্বনিত হলো বন্দেমাতরম। সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো অগ্নিকিশোর ক্ষুদিরামকে। ভাবতে অবাক লাগে, ১৮ বছরের এই যুবক চোখে দেখেছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্ন। হাসতে হাসতে মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন। শত প্রলোভনেও ব্রিটিশ রাজশক্তির সঙ্গে আপোষ করেননি।
- লেখায়: প্রকাশ রায়



0 মন্তব্যসমূহ