স্বদেশী আন্দোলনের অগ্রদূত অরবিন্দ ঘোষ

"দেবতার দ্বীপ হস্তে যে আসিল ভবে

সেই ক্ষুদ্র দূতে, বলো, কোন রাজা কবে
পারে শাস্তি দিতে, বন্ধন শৃঙ্খল তার----
চরণ বন্দনা করি, করে অভ্যর্থনা----"
কবি গুরু রবীন্দ্রাথ যার উদ্দ্যেশে এই প্রশস্তি রচনা করেছিলেন, তিনি হলেন ঋষি-কবি অগ্নিযুগের মহানায়ক, দার্শনিক এবং সিদ্ধযোগী শ্রী অরবিন্দ। এ এক আশ্চর্য দিনের কথা। প্রথম জীবনে যিনি সশস্ত্র সংগ্রামের স্বপক্ষে সওয়াল করেছেন, একের পর এক দুঃসাহসিক অভিযানে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন, পরবর্তী কালে যিনি অধ্যাত্মা সাধনার প্রতীক হয়ে যান, লোকচক্ষুর অন্তরালে দীর্ঘদিন অতিবাহিত করেন, পন্ডিচেরীতে স্থাপন করেন বিশ্বজনীন মানব ধর্মের এক মহান কেন্দ্র। তিনি হলেন ঋষি অরবিন্দ ঘোষ

অরবিন্দ ঘোষ
অরবিন্দ ঘোষ
অরবিন্দ ঘোষ জন্মগ্রহণ করেন ১৫ই আগস্ট ১৮৭২ সালে কলকাতায়। পিতার নাম ছিল কৃষ্ণধন ঘোষ ও মাতার নাম ছিল স্বর্ণলতা দেবী। পিতা কৃষ্ণধন ঘোষ ছিলেন তৎকালীন বাংলার রংপুর জেলার জেলা সার্জন। মাতা স্বর্ণলতা দেবী, ব্রাহ্ম ধর্ম অনুসারী ও সমাজ সংস্কারক রাজনারায়ণ বসুর কন্যা। রংপুরে তার পিতা ১৮৭১ সাল এর অক্টোবর থেকে কর্মরত ছিলেন, অরবিন্দ রংপুরে জীবনের প্রথম পাঁচ বছর পার করেন। ড ঘোষ এর আগে বিলেতের কিংস কলেজে চিকিৎসা শাস্ত্রে লেখাপড়া করেন। তিনি সন্তানদের ইংরেজি পন্থায় এবং ভারতীয় প্রভাবমুক্ত শিক্ষাদানের মনোভাব পোষণ করতেন। তাই ১৮৭৭ সালে দুই অগ্রজ সহোদর মনমোহন ঘোষ এবং বিনয়ভূষণ ঘোষ সহ অরবিন্দকে দার্জিলিংয়ের লোরেটো কনভেন্টে পাঠান হয়।
উপরলোরেট কনভেন্টে দুই বছর লেখাপড়ার পর ১৮৭৯ সালে দুই সহোদর সহ অরবিন্দকে বিলেতের ম্যাঞ্চেস্টার শহরে পাঠান হয় ইউরোপীয় শিক্ষালাভের জন্য। জনৈক রেভারেন্ড এবং শ্রীমতি ড্রিয়ুইটের তত্ত্বাবধানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। রেভারেন্ড ড্রিয়ুইট ছিলেন অ্যাংলিকান যাজক, রংপুরের ব্রিটিশ বন্ধুদের মাধ্যমে যার সাথে ড ঘোষের পরিচয় ছিল। ড্রিয়ুইট পরিবার তিন ভাইকে ব্যক্তিগত ভাবে শিক্ষাদান করেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ভারত ও তার সংস্কৃতির কোনরকম উল্লেখ না করার অনুরোধ ছিল। ১৮৮৪ সালে অরবিন্দ লন্ডনের সেইন্ট পলস স্কুলে ভর্তি হন। এখান থেকে গ্রীক, লাতিন এবং শেষ তিন বছরে সাহিত্য বিশেষত ইংরেজি কবিতা অধ্যয়ন করেন।
ড কে,ডি, ঘোষ ভেবেছিলেন, তার তিন পুত্রই সম্মানসূচক ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাশ করবেন, কিন্তু ১৮৮৯ সালে দেখা গেল একমাত্র সবার ছোট অরবিন্দই বাবার আশা পূরণ করতে পারবেন, বাকি ভাইয়েরা ইতোমধ্যেই ভিন্ন দিকে নিজ নিজ ভবিষ্যতের পথ বেছে নিয়েছেন। আইসিএস কর্মকর্তা হওয়ার জন্য ছাত্রদেরকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাশ করতে হত এবং ইংরেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর অধ্যয়নের অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন ছিল। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বৃত্তি অর্জন ছাড়া ইংরেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করা অরবিন্দের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কিংস কলেজের বৃত্তি পরীক্ষায় পাশ করায় তা সম্ভবপর হয়ে ওঠে। তিনি কয়েক মাস পর আইসিএস এর লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেন ২৫০ প্রতিযোগীর মাঝে ১১তম স্থান অধিকার করেন। He spent the next two years at the King's College.
অরবিন্দ ঘোষ ভারতবর্ষে এসে বুঝতে পারলেন যে, বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে হবে। গুজরাটি, মারাঠি, বাংলা শিখতে শুরু করলেন। ৬ টি ভারতীয় ভাষা আয়ত্ত করলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও স্বামী বিবেকানন্দের বই পড়তে শুরু করেন। একজনের লেখায় তিনি পেলেন অনুপ্রেরণা, দেশপ্রেম, উদ্বুদ্ধ হলেন। অন্যজনের লেখার মাধ্যমে চিনলেন ভারতাত্মাকে। 'হিন্দু প্রকাশ' সংবাদপত্রে উদ্দীপনাময় ভাষায় দেশাত্মবোধক প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের জন্ম হয়, মহামতি গোপালকৃষ্ণ গোখলে, দাদাভাই নৌরজি, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মদনমোহন মালব্য বিশিষ্ট নেতারা কংগ্রেসের ডাকে সাড়া দেয়। তখন কংগ্রেস ইংরেজদের কাছে আবেদন নিবেদনের নীতি প্রয়োগ করত। অরবিন্দ এই নীতি সমর্থন করে নি। প্রথম থেকেই তিনি ছিলেন সর্বাত্মক বিপ্লবের মতবাদে বিশ্বাসী। এই সময় অরবিন্দের জিবনে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে যায়।
অরবিন্দ ঘোষ
অরবিন্দ ঘোষ
অরবিন্দ ঘোষ ১২ বছর বয়সে বারোদা থেকে কলকাতায় চলে আসেন। ভারত বঙ্গবিভাগ বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেন। যাদবপুরে স্থাপিত হল বিদ্যায়তন। সেই বিদ্যায়তনের ভার অরবিন্দের ওপর অর্পণ করা হয়। 'বন্দেমাতরম' পত্রিকাতে প্রবন্ধ লিখে কারারুদ্ধ হন। শেষ অব্দি প্রমাণের অভাবে মুক্তি পান তিনি। ১৯০৮ সালের ২রা মে পুলিস কলকাতায় অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে আরো অনেক বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করে। মোট ৪৭ জন আসামির নামে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও ধবংসাত্মক কার্যকলাপের অপরাধে অভিযোগ শুরু করেন। কারাগারে মামলার শুনানির সময় অরবিন্দ বলেন---- ' আমি দেশে স্বাধীনতার আদর্শ প্রচার করেছি। এই কাজে যদি আইন বিরুদ্ধ হয়, তাহলে আমি স্বীকার করছি যে, আমি দোষী।
অরবিন্দ ঘোষের মামলা পরিচালনা করেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। বিচারে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়। এরপর তিনি কর্মযোগিন নামে ইংরেজিতে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করে। ক্রমে চিন্তার পরিবর্তন আসার ফলে তার আধ্যাত্মিক ভাবনার উদয় হয়। ১৯১০ সালে সকলের অগোচরে চন্দননগরে চলে যান। সেখান থেকে চলে যান দক্ষিণ ভারতের পন্ডিচেরীতে । তখন তিনি ঋষি অরবিন্দ নামে বিশ্বখ্যাত হয়েছেন। অরবিন্দ বলেছিলেন-- " যুগ যুগান্তর ধরে ভারত মরেনি, তার সৃষ্টির শেষ কথা এখনও বলা হয় নি, সে বেঁচে আছে নিজের জন্য নয়, সমগ্র পৃথিবীর জন্য। ১৯৫০ সালের ৫ই ডিসেম্বর পন্ডিচেরীতে মহাযোগী অরবিন্দের মহাপ্রয়াণ ঘটে।
— লেখায়: প্রকাশ রায়

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ