ফাঁসির মঞ্চে বলিদানকারী দীনেশচন্দ্র গুপ্ত (দীনেশ গুপ্ত)

স্বাধীনতা সংগ্রামের আরো এক মহান বিপ্লবী দীনেশচন্দ্র গুপ্ত। মেদিনীপুরে তার সংগঠন পরপর তিন জন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করেছিল। ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর বিপ্লবী বিনয় বসুর নেতৃত্বে দীনেশচন্দ্র গুপ্ত ও বাদল গুপ্ত রাইটার্স বিল্ডিংভবনে অভিযান চালিয়। এরপর তারা আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন। বিনয় বসুবাদল গুপ্ত গুরুতর আহত হয়ে মারা যান, মৃতপ্রায় দীনেশকে পুলিশ বাঁচিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। বিচারে তার ফাঁসির আদেশ হয়। স্বাধীনতার পর তার ও তার অপর দুই সহবিপ্লবীর সম্মানার্থে কলকাতার প্রসিদ্ধ ডালহৌসি স্কোয়ারের নাম বিনয়-বাদল-দীনেশ রাখা হয়।

দীনেশ গুপ্ত
দীনেশ গুপ্ত

৬ই ডিসেম্বর ১৯১১ সালে দীনেশ গুপ্তের জন্ম হয়, ঢাকা জেলার যশোলঙ গ্রামে। তার পিতার নাম ছিল সতীশচন্দ্র গুপ্ত ও মায়ের নাম বিনোদিনী দেবী। দীনেশ গুপ্তের ডাকনাম ছিল নসু।। কৈশোরেই গুপ্ত সমিতিতে যোগ দেন দীনেশ গুপ্ত। প্রথমে তিনি ঢাকা অঞ্চলের কাজ করতেন। পরে তাকে মেদিনীপুরে সংগঠনের কাজে যেতে হয়। মেদিনীপুর গিয়ে সম্পূর্ণ অচেনা অজানা জায়গার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন। সেখানে সংগঠনটিকে অত্যন্ত সফল করে তোলেন। মেদিনীপুরের সংগঠন এমন দৃঢ় হয়ে উঠেছিল যে, বিপ্লবীরা পরপর তিনবার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করতে সমর্থ হয়েছিল। দীনেশ গুপ্তের মধ্যে এক ধরনের দর্শন চিন্তা কাজ করত। লেখার দিকে বিশেষ নজর ছিল তার। একাধিক চিঠির মাধ্যমে তিনি তার মানসিকতার কথা বলে গেছেন।
মাত্র বিশ বছর বয়সে তিনি যে সাংগঠনিক সততার পরিচয় দিয়েছেন, তা আমাদের অবাক করে দেয়। মৃত্যু ছিল তার পায়ের ভৃত্য। মৃত্যু সম্পর্কে যেসব উক্তি করেছেন, তার মধ্যে নির্লিপ্ত মনের ছায়া আছে। দীনেশ ছোটবেলা থেকেই খেতে খুব ভালো বাসতেন। সেই সময়কার দুটি গল্পঃ শুনলে আমরা তার এই মনোভাবের পরিচয় পাবো। তখনকার দিনে বিপ্লবীদের বাধ্যতামূকভাবে একটা কাজ করতে হত। নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য সকালে ও বিকালে মার্চ করতে হত। পাড়ি দিতে হত গ্রাম থেকে গ্রামান্তর। দলনেতা জ্যোতিষ জোয়ারদারের নেতৃত্বে দীনেশ মার্চ করে এগিয়ে চললেন বিক্রমপুর গ্রামের পথ ধরে। একটানা হেঁটে সন্ধ্যা নাগাদ একটা বাজারে যাত্রার বিরতি হল। এবার ফিরতে হবে সকলের খিদে পেয়েছে। দল বেঁধে একটা মিষ্টির দোকানে হাজির হলেন সকলে। গ্রামের বাজারের দোকান, সবসময় মিষ্টি মজুত থাকে। সব মিষ্টি শেষ হয়ে গেল। এবার একটু বিশ্রাম নিতে হবে। দীনেশ তখনও ভাবছেন আর কিছু খেলে ভালো হয়।
উকিঝুকি মেরে দেখলেন, দোকানের কোন এক কড়াইয়ে চিনির সিরা আছে। হাসি মুখে দোকানির দিকে তাকিয়ে বললেন-----ওটাই দিন চালান করে দিই। দোকানী অবাক, সর্বনাশ ওটা কয়েক দিনের বাসি, খেলে বমি হবে, ডাক্তার ডাকতে হবে। কিন্তু কে শুনে কার কথা, দোকানি বাঁধা দেওয়ার আগে দীনেশ কড়াইটা দুহাতে তুলে নিলেন মুখের কাছে। এক চুমুকেই কড়াই ফাকা করে দিল। দীনেশ এটা খেয়ে মোটেই অসুস্থ্য হয়ে পরেনি। ভীষন শারীরিক ক্ষমতা ছিল তার। তেমনই হজম করার ক্ষমতা ছিল। এরকম ঘটনা তার জিবনে অনেক ঘটেছে।
বিনয় বসু
বিনয় বসু
কৈশোরে দীনেশ বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স (বিভি) নামে একটি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের সদস্য হন। ১৯২৬ সালে ঢাকা বোর্ড থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি মেদিনীপুরে কর্মরত তার বড়োদাদা যতীশচন্দ্র গুপ্তের কাছে বেড়াতে আসেন। এই সময় থেকেই মেদিনীপুর শহরে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার সুপ্ত বাসনা তার মনে জাগে। কিন্তু দলের নির্দেশে সেবার তাকে ঢাকায় ফিরে আসতে হয়েছিল বলে তিনি মেদিনীপুরে বিশেষ কিছুই পরে উঠতে পারেননি। ১৯২৮ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষা দেন। কিন্তু এই পরীক্ষায় তিনি কৃতকার্য হতে পারেননি। এরপর তিনি মেদিনীপুরে গিয়ে পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নেন। দলের তরফ থেকে দীনেশকে মেদিনীপুরে বিভির শাখা স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মেদিনীপুরে এসে দল সংগঠন ও সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যান তিনি। ঢাকা কলেজে পড়ার সময় ১৯২৮ সালে দীনেশ 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস'-এর কলকাতা সেশনের প্রাক্কালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস সংগঠিত 'বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সে যোগদান করেন। শীঘ্রই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স একটি সক্রিয় বিপ্লবী সংগঠনে পরিবর্তিত হয় এবং কুখ্যাত ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারদেরকে হত্যা নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করে। স্থানীয় বিপ্লবীদের আগ্নেয়াস্ত্র চালনা শেখানোর জন্য দিনেশ গুপ্ত কিছু সময় মেদিনীপুরেও ছিলেন। তার প্রশিক্ষিত বিপ্লবীরা ডগলাস, বার্জ, এবং পেডি--এই তিনজন জেলা ম্যাজিস্ট্রটকে পরপর হত্যা করেছিল।
তাদের সংগঠনটি জেলের ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এনএস সিম্পসনকে টার্গেট করেছিল যে কিনা জেলখানার বন্দীদের উপর পাশবিক নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত ছিল। এই বিপ্লবীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তারা শুধু সিম্পসনকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হবেন না, বরং কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে অবস্থিত ব্রিটিশ শাসকদের সচিবালয় রাইটার্স ভবন আক্রমণ করে ব্রিটিশ অফিস পাড়ায় ত্রাস সৃষ্টি করবেন । ১৯৩০ সালের ৮ই ডিসেম্বর দীনেশ তার দুই সঙ্গী বিনয় বসু এবং বাদল গুপ্ত সহ ইউরোপীয় পোশাকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করেন এবং সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন। ব্রিটিশ পুলিশ গুলি চালানো শুরু করে। যার ফলশ্রুতিতে এই তিন তরুণ বিপ্লবীর সাথে পুলিশের একটি সংক্ষিপ্ত বন্দুকযুদ্ধ হয়।টোয়াইনাম, প্রেন্টিস এবং নেলসন-এর মত অন্য কিছু অফিসার গোলাগুলিতে আহত হয়। পুলিশ দ্রুতই তাদেরকে পরাভূত করে ফেলে। কিন্তু এই তিনজনের গ্রেফতার হওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না। বাদল গুপ্ত পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে নিয়েছিলেন, অন্যদিকে বিনয় এবং দিনেশ নিজেদের রিভলবার দিয়ে নিজেদেরকেই গুলি করেছিলেন। বিনয়কে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তিনি ১৯৩০ সালের ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ মৃত্যুবরণ করেন।
দীনেশের ভাগ্যটাই খারাপ ছিল, দীনেশকে বাঁচিয়ে তুলতে সক্ষম হন ইংরেজ সরকার। এবার শুরু হল বিচারের পালা এবং বিচারের রায় ছিল সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ড ও খুনের জন্য ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু। ১৯৩১ সালের ৭ ই জুলাই আলীপুর জেলে ভোর রাতে হাসতে হাসতে ফাঁসির দরি গলায় তুলে নিলেন। বাংলা মায়ের দামাল ছেলেদের আর একজন প্রেরণার প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন পৃথিবীর মাটি থেকে।

লেখায়: প্রকাশ রায়

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ