বীর বাঘা যতীন

নদীয়া জেলার একটি গ্রাম। সন্ধ্যার অন্ধকারে গ্রামের পথঘাট জনশূন্য হয়ে যায়। মনে হয় বুঝি শ্মশানের নিঝুমতা নেমে এসেছে। কিন্তু কেন? বিরাট এক রয়েল বেঙ্গল টাইগার গ্রামে হানা দিতে শুরু করেছে। বাঘটা ভীষণ হিংস্র। গরিব চাষিদের গরু-বাছুর গোয়াল থেকে টেনে নিয়ে যায়। চাষিরা কান্নাকাটি শুরু করে দিল। কে তাদের বাঘের অত্যাচার থেকে বাঁচাবে? তখন ওই গ্রামে এসেছিলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তিনি কলকাতায় সরকারি চাকরি করতেন। এই গ্রামে মামার বাড়িতে তার ছোটবেলার দিনগুলো কেটে ছিল। গ্রামের অনেকের সাথে সুন্দর সম্পর্ক। বিশেষ করে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষদের তিনি খুবই ভালোবাসেন। যতীন মুখার্জি ঠিক করলেন তিনি বাঘের সঙ্গে লড়াই করবেন। কিন্তু কি ভাবে ? যতীনের কোন বন্দুক ছিল না। একটা ভোজালি দিয়ে বাঘের মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য প্রস্তুত হলেন।

বাঘা যতীন
বাঘা যতীন
অন্য কেউ এভাবে লড়াইতে অবতীর্ণ হলে গ্রামবাসিরা তাকে নিবৃত করার চেষ্টা করত। কিন্তু সেদিনের তরুণ যতীনকে তারা ভালোভাবেই চিন্তু। তারা জানত, যতীন এর মধ্যে অসম্ভব সাহস আছে। দেহে আছি অদ্ভুত শক্তি। হৃদয় আছে প্রবল পরোপকার বৃত্তি। যতীনের এই অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় গ্রামবাসীরা অনেকবার পেয়েছিল । যতীন বর্ষার দুরন্ত নদী সাঁতারে পারাপার করতেন। চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে পড়েছেন। পথের কলেরা রোগের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। শেষ অব্দি এই বীর যুবক যতীন্দ্রনাথ বাঘ মারার সংকল্প গ্রহণ করায় গ্রামবাসীরা হাফছেড়ে বেঁচে ছিল। যতীনকে তারা ত্রাণকর্তা বলে মনে করল। যতীনের মামাতো ভাইয়ের একটি বন্দুক ছিল। মামাতো ভাই বন্দুক নিয়ে যতীনের সঙ্গী হলেন। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর বাঘের সঙ্গে দেখা হলো। মামাতো ভাই বন্দুকের গুলিতে বাঘটাকে বধ করার চেষ্টা করলেন। লক্ষ্যভ্রষ্ট হল গুলিটি। বাঘটি আহত হল। আহত বাঘ ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে, গুলি খেয়ে বাঘটি যতীন্দ্রনাথের দিকে ছুটে এলো। যতীন্দ্রনাথ কে আক্রমণ করল?

বাঘা যতীন
বাঘা যতীন
যতীন্দ্রনাথ কোন বিপদের মুখে পিছপা হননি। এবারও পিছপা হলেন না। তিনি অসীম বিক্রমে বাঘের গলা চেপে ধরলেন। তার মাথার ভোজালি দিয়ে বাঘটিকে বারবার আঘাত করতে লাগলেন। বাঘটি যতীনকে কামড়াবার চেষ্টা করলো। যতীন্দ্র বাঘটিকে জাপ্টে ধরে ভোজালি দিয়ে বারবার মারলেন। জড়াজড়ি করে বাঘটিকে ধরে মাটিতে পড়ে গেলেন। বাঘ তার দুটি হাঁটুতে কামড় বসালো। নখ দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করল সমস্ত শরীর। রক্তাক্ত যতীন তখনও উন্মাত্তের মতো বাঘটার সঙ্গে লড়াই করছেন। পশু শক্তি শেষ পর্যন্ত মানুষের শক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হল। নিজের দেহের আঘাত আগ্রহ করেই হিংস্র ভয়ঙ্কর বাঘটিকে মাটিতে চেপে ধরলেন। শেষ অব্দি ভোজালিটা বাঘের পেটে বসিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। সেই আঘাতে বাঘটি শেষ হয়ে গেল। আর সেদিন থেকে সকলের কাছে তিনি পরিচিত হলেন বাঘাযতীন হিসেবে। বাঘাযতীন শুধুমাত্র বাঘ মেরে জীবন কাটান নি। তিনি লড়াই করেছিলেন ব্রিটিশ সিংহের সঙ্গে। এই ব্রিটিশ সিংহকে সম্মুখ সমরে হারিয়ে দেবার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৮৭৯ সালের ৭ ই ডিসেম্বর নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহাকুমার ছোট্টশান্ত কয়া গ্রামে মামার বাড়িতে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তার পিতার নাম ছিল উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও মাতা শরৎশশী দেবী।
যতীন্দ্রনাথের পৈতৃক বাসস্থান ছিল যশোর জেলা ঝিনাইদহ রিসখালী গ্রামে।মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তার পিতার মৃত্যু হয়। ছেলের হাত ধরে মা এলেন মামার বাড়িতে। মামার বাড়িতেই যতীন্দ্রনাথ বড় হয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন দুরন্ত প্রকৃতির। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিশে নানা ধরনের দুষ্টুমি করে বেড়াতেন। আম বাগান থেকে আম চুরি করতেন। পুকুরে মাছ ধরে নিয়ে যেতেন। রাতের অন্ধকারে ফল চুরি করতেন। গ্রামবাসীরা তার দাপটে অস্থির হয়ে উঠেছিল। মাঝেমধ্যে যতীন্দ্রনাথের মামার কাছে তাঁরা নালিশ করত। মামা কিন্তু ভাগ্নেকে খুবই ভালবাসতেন। মামা ছিলেন জাতীয়তাবাদের এক আদর্শ কর্মী। মনেপ্রাণে চাইতেন ইংরেজ একদিন এদেশে থেকে দূরে চলে যাবে। ভাগ্নেকে রামায়ণ-মহাভারতের অনেক কাহানি শোনাতেন। তখন থেকেই যতীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। পড়াশোনায় খুব একটা তুখোড় ছিলেন না, তবে মন দিয়ে পড়ার বই পড়তেন। পড়াশোনার চেয়ে নানান খেলা শরীরচর্চা প্রভৃতি ছিল তার বেশি উৎসাহ। স্কুলে পড়ার সময় একদিন পাগলা ঘোড়াকে কব্জা করে অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। কৃষ্ণনগরের এ.ভি স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
এলেন কলকাতায়, কলেজে ভর্তি হলেন। কিন্তু তখন থেকেই যতীন্দ্রনাথ ছিলেন স্বাধীনচেতা মানুষ। তিনি ঠিক করলেন যে, পড়াশোনায় আর সময় নষ্ট করবেন না। শর্টহ্যান্ড ও টাইপ রাইটিং শিখলেন। তখনকার দিনে এই দুটি বৃত্তি শিক্ষার খুবই দাম ছিল। ১৯০৪ সালে সরকারি চাকরি লাভ করলেন। এই চাকরিতে যোগ দেবার আগে থেকেই বিপ্লবী দলের সঙ্গে তার যোগাযোগ ঘটে গিয়েছিল। ১৯o৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন কে কেন্দ্র করে দেশাত্মবোধের প্রেরনায় জেগে উঠল সারাদেশ, সেই আবর্তে যতীন্দ্রনাথ ভেসে গেলেন। অনুশীলন সমিতি তে যোগদান করলেন। একদিকে অফিসের কাজ, অন্যদিকে সংগঠনের দায়িত্ব। তখন যতীন্দ্রনাথকে ব্যস্ত প্রহর কাটাতে হচ্ছে। তার ওপর বেশ কয়েকটি কাজ দেওয়া হয়েছিল, তিনি তরুণ বিপ্লবীদের গীতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করতেন। তরুণদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন যতীন্দ্রনাথ। ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরামের বোমা নিক্ষেপের পর ইংরেজরা কঠিন-কঠোর আঘাত করতে থাকে। ইংরেজরা মনে করল যে, আলিপুর বোমা মামলার আসামিদের দ্বীপান্তরে পাঠিয়ে তারা স্বাধীনতা সংগ্রামকে ব্যাহত করে দেবে। তখন বেশিরভাগ জাতীয় নেতা কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন। এই সময় এগিয়ে এলেন বাঘাযতীন তিনি ওই সংগ্রামকে অব্যাহত রেখেছিলেন।
বাঘাযতীন এর বিরুদ্ধে হাওড়া ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হলো। এক বছর ধরে বাঘাযতীন কে নির্জন কারাগারে থাকতে হলো। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, তিনি ভারত সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রচেষ্টার অংশ নিয়েছিলেন। সরকারি কর্মীকে হত্যা করেছিলেন। এই ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বাঘাযতীন শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছিলেন, কিন্তু সরকারী চাকরী চলে গেল। তখন বাঘাযতীন ঠিকাদারি কাজ শুরু করলেন। তার গতিবিধির ওপর ব্রিটিশ গুপ্তচররা তীক্ষ্ণ নজর রাখত। তবে তাকে অনুসরণ করা সম্ভব ছিল না। তিনি ৭৫ মাইল সাইকেল চালাতে পারতেন, চলন্ত মেল ট্রেনে ওঠা নামা করতে পারেন। অসাধারণ শক্তি ছিল বাঘা যতীনের রূপকথার বিস্ময়কর নায়ক ছিলেন তিনি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল, বাঘাযতীন গেরিলা লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হলেন। তিনি সর্বভারতীয় বিপ্লবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপনে চুক্তিবদ্ধ হয়ে জাপান-জার্মানি থেকে অস্ত্রাদি আমদানি করে সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেন। ঠিক হয় 'মেভারিক' নামক জার্মান জাহাজে অস্ত্র আইনে বালেশ্বর এর রেললাইন অধিকার করে ইংরেজদের যাতায়াত পথ অবরোধ করবেন। বাঘাযতীন তার চারজন সহকর্মীকে নিয়ে চলে গেলে বালেশ্বর এর কাছে কোপাতপোদা গ্রামে। সন্ন্যাসী সেজে আশ্রম গড়লেন। কবে জার্মান যুদ্ধজাহাজ পৌঁছাবে তার জন্য প্রতীক্ষার প্রহর শুরু হল। এই জাহাজ শেষ পর্যন্ত ভারতবর্ষে পৌঁছতে পারেননি। বিপ্লবীদের প্রতীক্ষা ব্যর্থ হলো। তবুও বাঘাযতীন বিন্দুমাত্র হতাশ হলেন না, তিনি আবার অস্ত্র আমদানির পরিকল্পনা করলেন। দ্বিতীয়বারও অস্ত্র পৌঁছলনা। বিপ্লবীরা পথেই ধরা পড়ে গেলেন। শুরু হলো পুলিশের তল্লাশি। পুলিশ জানতে পারল যে বিপ্লবীদের একটা দল বালেশ্বরে লুকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কমিশনার টেগার্ট বালেশ্বরে পৌঁছে গেলেন। সেখানে এক সাংকেতিক লিপি পাওয়া গেল। ওই লিপিতে বলা হয়েছে রামানন্দ স্বামী যেন তার শিষ্যদের নিয়ে এখনই তীর্থভ্রমণে চলে যান। এখানে অনেকেই আশ্রম বাসি হয়েছে।
গ্রামবাসীদের মুখ থেকে বাঘাযতীন ওই ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদটা শুনতে পেলেন -- বিরাট পুলিশবাহিনী ছুটে আসছে তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য। বাঘাযতীন তার কিশোর চার সঙ্গী চিত্তপ্রিয়, মনোরঞ্জন, নীরেনজ্যোতিষকে বললেন, তার সঙ্গ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে। পুলিশরা এদের কাউকে চেনে না। তাই তারা চালাতে পারবেন। বিপ্লবী কিশোররা নেতাকে ত্যাগ করতে রাজি হলেন না। তারা বললেন যে, আমরা সম্মুখে সমরে প্রাণ বিসর্জন দেবো তবুও আপনাকে ত্যাগ করবো না। বাঘাযতীন সহকর্মীদের এই সাহস দেখে অবাক হয়ে গেলেন। ১৯১৫ সালের ৯ ই সেপ্টেম্বর বুড়িবালাম নদীর তীরে চাষখণ্ড নামে একটা জায়গায় বাঘা যতীন তার চার সঙ্গীকে নিয়ে খাদের মধ্যে লুকিয়ে রইলেন।
একদিকে মাত্র ৫ জন আর অন্যদিকে অসংখ্য সৈন্য। এবার শুরু হলো বুড়িবালামের ঐতিহাসিক যুদ্ধ, গুলির জবাবে গুলি। তারা ৫ জন একসঙ্গে গুলি করতে শুরু করলো। যাতে শত্রু পক্ষ জানতে না পারে তারা ক-জন। বেশ কিছু ব্রিটিশ সৈন্য হতাহত হলো। শেষ অব্দি বিপ্লবীদের গুলি শেষের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ যুদ্ধ চলল, ঠিক ওই সময় পুলিশের গুলি এসে আঘাত করলো চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরীকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন চিত্তপ্রিয়, তখনো যুদ্ধ চলছিল। যন্ত্রণা কাতর কন্ঠে তিনি বললেন - বড়দা, আমি চললাম।
চিত্তপ্রিয় মৃত্যুপথযাত্রী একফোঁটা জলের জন্য ছটফট করছিল। এদিকে বাঘা যতীন গায়েও গুলি লেগেছিল। কিন্তু তার শেষ পর্যন্ত লড়াই করার কথা, চিত্তপ্রিয়কে জল খাওয়ানোর জন্য নিজের পরনে রক্তমাখা সাদা শার্ট উড়িয়ে যুদ্ধ বিরতির সংকেত দিলেন ও আত্মসমর্পণ করেন। ইংরেজ সাহেব কাছে এলেন, বাঘা যতীন দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন - শুধু এর মুখে এক ফোঁটা জল দেবার জন্য আমি যুদ্ধ বন্ধ করে ধরা দিচ্ছি। কিছুক্ষণ পরেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তরুণ কিশোর চিত্তপ্রিয়। আহত বাঘাযতীনকে বালেশ্বর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। পরদিন হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দিনটি ছিল ১৯১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। মনোরঞ্জন এবং নীরেনকে ফাঁসি দেওয়া হল। জ্যোতিষকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দণ্ড দিয়ে পাঠানো হলো আন্দামানে। সেখানে তার ওপর অমানুষিক অত্যাচার করা হলো। এই ভয়ঙ্কর অত্যাচারী তিনি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। তখন তাকে বহরমপুর জেলে রাখা হয়। বন্দী অবস্থাতেই জ্যোতিষের মৃত্যু হয়। এভাবেই শেষ হয়ে গেল বুড়িবালামের লড়াই।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন প্রশস্তি রচনা করে- "বাঙালির রন দেখে যারে তোরা রাজপুত, শিখ মারাঠি যাত বালাশোর, বুড়ি-বালামের তীর নব ভারতের হলদিঘাট।"

লেখায়: প্রকাশ রায়

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ