ডালহৌসির রক্তমাখা দুপুর — বাদল গুপ্ত

দিনটি ছিল ৮ই ডিসেম্বর ১৯৩০। দুপুরের কলকাতা তখনও সবেমাত্র ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছুঁয়েছে। তিনজন তরুণ, সাহেবি পোশাক পরে সোজা এগিয়ে যাচ্ছেন রাইটার্স বিল্ডিংয়ের দিকে। মুখে কোনো ভয় নেই, চলনে কোনো দ্বিধা নেই। তারা যেন শহরের ব্যস্ততার মধ্যেও একটি অদৃশ্য সংকল্পের ছায়া বইয়ে নিয়ে চলেছেন। সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন দোতলার বারান্দায়, আর সেখানে কর্নেল সিম্পসনের দফতরের সামনে দাঁড়ালেন। ইউরোপীয় সার্জেন্টকে বললেন, তারা সিম্পসনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। সিম্পসন তখন টেবিলে বসে ফাইল দেখছেন। হঠাৎ দরজা খুলে ঢুকে পড়ল তিন তরুণ— আর পরমুহূর্তেই গর্জে উঠল আগ্নেয়াস্ত্র। মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল অত্যাচারী সিম্পসন। একটি মূহূর্তেই ইতিহাসের পাতায় উঠল তিনটি নাম— বিনয়-বাদল-দীনেশ

বাদল গুপ্ত
বাদল গুপ্ত

রাইটার্সের ভেতরে শুরু হয়ে গেল আতঙ্ক। শব্দ, চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ— চারদিকে শুধু গোলাগুলির তীব্র প্রতিধ্বনি। ইংরেজ সেনারা ছুটে এলো বন্দুক তুলে। অফিসাররা আগুন ঢালছে গুলির বানে। কলকাতার সেই ব্যস্ত বিল্ডিং তখন পরিণত হলো যুদ্ধক্ষেত্রে। অথচ আশ্চর্য, অসংখ্য গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো, তিন তরুণের গায়ে একটি গুলিও লাগল না। বারান্দা পেরিয়ে তিন বিপ্লবী পৌঁছে গেলেন পাসপোর্ট অফিসের সামনে। গুলি চলছে দু’দিক থেকে, নিরন্তর, বিনিময়ে প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে তিনটি তরুণ বুক।

ধীরে ধীরে অস্ত্রের সব গুলি শেষ হয়ে এলো। প্রত্যেকের কাছে বাকি রইল মাত্র একটি করে গুলি। ধরা পড়া মানেই অপমান, যন্ত্রণা, দেশের তথ্য ফাঁস— আর তাদের শিক্ষা ছিল স্পষ্ট, বিপ্লবীর কাছে আত্মসমর্পণ বলে কিছু নেই। বিনয় নির্দেশ দিলেন, “সবাই প্রস্তুত হও।” পকেট থেকে বের হলো উগ্র বিষ। বাদল বিষ গ্রহণ করলেন প্রথমেই। বিনয় নিজের মাথায় গুলি চালালেন। আহত দীনেশও পটাশিয়াম মুখে দিয়ে শুয়ে পড়লেন, কিছু বোঝার আগেই জ্ঞান হারিয়ে গেল।

হাসপাতালে পৌঁছল তারা— প্রাণহীন বাদল, মৃত্যুপথযাত্রী বিনয়, আর অচেতন দীনেশ। বাদল আর জাগলেন না। বিনয়ও হাসপাতালে চোখ বুজলেন। দীনেশ বেঁচে রইলেন, শুধু মৃত্যুর দিকে আরেকটি দীর্ঘ পথ টানতে টানতে। বিচারে দীনেশের ফাঁসির আদেশ হলো।

এবার শুনে নেওয়া যাক বাদল গুপ্তের কথা। ১৯১২ সালে ঢাকার পূর্ব শিমুলিয়া অঞ্চলে জন্ম। পিতা অবনীন্দ্রনাথ গুপ্ত। ছোট থেকেই ছিলেন খামখেয়ালি, ভীষণ আনুগত্যবোধ আর সাহস যার জীবনের সত্য। ব্যায়ামপ্রিয় ছেলেটি খুব বেশি পড়াশোনা করেননি, তবে যেটুকু করেছেন মন দিয়ে। বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স দলে যোগ দিয়েই তিনি গোপন খবর সংগ্রহ, নেতৃত্বের নির্দেশ পালন, বিপ্লবের কাজে নানা সাহায্যে নিজেকে যুক্ত করলেন।

নেতারা তার চোখে দেখেছিলেন এক নির্মল আস্থা, এমন আনুগত্য যে নিজের প্রাণও দিতে পারে দেশের জন্য। তাই সিম্পসন হত্যার দায়িত্ব পড়ল তাঁর কাঁধে। জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি প্রমাণ করেছিলেন— আদেশই ছিল তাঁর ধর্ম

কলকাতার ডালহৌসি অঞ্চলের সেই অলিন্দ আজও যেন মৃদুস্বরে একটি গল্প বলে— “বি-বা-দী বাগ।” তিনটি শব্দ, তিনটি নাম, তিনটি জীবন। বিনয়, বাদল, দীনেশ— তিন তরুণ যারা নিঃশব্দে শহরের দুপুরটিকে রক্তমাখা ইতিহাসে বদলে দিয়েছিল। আজও যখন রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়ানো যায়, মনে হয় যেন দূর থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছে, আর তিনটি তরুণ হাসিমুখে বলছে—

“দেশের জন্য প্রাণ দিলাম, এখন তোমরা দেশটাকে বাঁচিয়ে রেখো।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ