চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী নামটা সবাই জানি বুড়িবালামের তীরে খণ্ডযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই যুদ্ধ ব্রিটিশ বিরোধী ভারতীয় বিপ্লবীদের ছিল। তিনি বিপ্লবী বাঘা যতীনের নেতৃত্বে পরিচালিত বুড়িবালামের তীরে খণ্ডযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী ১৮৯৪ সালের ৬ই ডিসেম্বর মাদারিপুরের খালিয়া গ্রামে এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতার নাম ছিল পঞ্চানন রায়চৌধুরী ও মাতার নাম ছিল সুখদা সুন্দরী দেবী। তার পিতা পঞ্চানন রায়চৌধুরী ছিলেন মাদারিপুর শহরে অনারারী ম্যাজিস্ট্রট।
![]() |
| চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী |
চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী প্রথমে থালিয়া হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে মাদারিপুর হাই স্কুলে ভর্তি হন। মাদারিপুর হাই স্কুলে থাকাকালীন ১৯১০ সালে মাদারিপুর সমিতির (বিপ্লবী দলের) সদস্য হন। চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী মহান বিপ্লবী পূর্ণচন্দ্র দাসের সহকর্মী হিসেবে পূর্ণচন্দ্র পরিচালিত গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন-এর সদস্য ছিলেন। ১৯১৩ সালে ডিসেম্বর মাসে প্রথম ফরিদপুর ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরীকে। তিনি গ্রেপ্তার হয়ে পাচঁ মাস জেলে বন্দী ছিলেন ও পরে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান।
চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯১৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন দিবসে রাস্তায় কর্তব্যরত পুলিস ইনস্পেকটর সুরেশ মুখার্জিকে কয়েকজন সহকর্মীর সাহায্যে হত্যা করেন। বিপ্লবী যতীন মুখার্জীর (বাঘা যতীন) সহকর্মী হিসেবে জার্মানি, জাপান, আমেরিকা ও ডাচ ইন্ডিজ থেকে অস্ত্রশস্ত্র আমদানির চেষ্টা করেন চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী। ১৯১৫ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর অস্ত্রশস্ত্র আমদানির চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে গভীর রাত্রে বাঘা যতীন (যতীন মুখার্জী) নিজের সাময়িক আস্তানা মহলডিহাতে ফিরে এলেন। সঙ্গে ছিলেন চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, জ্যোতিষচন্দ্র পাল, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত এবং নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত।
![]() |
| বাঘা যতীন |
চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, বাঘা যতীন ও বাকি সঙ্গীরা মিলে ৮ই সেপ্টেম্বর সারাদিন কেটে গেল তাদের গভীর জঙ্গলে। সারারাত পায়ে হেঁটে ৯ সেপ্টেম্বর ভোরবেলা পৌঁছলেন বালেশ্বরের বলরামগড়িতে বুড়িবালাম (উড়িষ্যায় একে বলে "বুড্ঢাবালাঙ্গ") নদীর উপকণ্ঠে। সাঁতার কেটে নদীর ওপারে গিয়ে যুদ্ধের পক্ষে মোটামুটি উপযুক্ত শুকনো এক ডোবার মধ্যে আশ্রয় নিলেন তারা। বিপরীতপক্ষে চার্লস টেগার্ট, কমান্ডার রাদারফোর্ড, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিলভি অসংখ্য সশস্ত্র পুলিস ও সামরিক বাহিনী নিয়ে হাজির হয়েছিল। পরীখার আড়ালে বাঘা যতীনের নেতৃত্বে পাঁচজন, হাতে মাউজার পিস্তল।
চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরীর জিবনে এটাই ছিল শেষ যুদ্ধ। একদিকে মাত্র ৫ জন আর অন্যদিকে অসংখ্য সৈন্য। এবার শুরু হলো বুড়িবালামের ঐতিহাসিক যুদ্ধ, গুলির জবাবে গুলি। তারা ৫ জন একসঙ্গে গুলি করতে শুরু করলো। যাতে শত্রু পক্ষ জানতে না পারে তারা ক-জন। বেশ কিছু ব্রিটিশ সৈন্য হতাহত হলো। শেষ অব্দি বিপ্লবীদের গুলি শেষের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ যুদ্ধ চলল, ঠিক ওই সময় পুলিশের গুলি এসে আঘাত করলো চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরীকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন চিত্তপ্রিয়, তখনো যুদ্ধ চলছিল। যন্ত্রণা কাতর কন্ঠে তিনি বললেন - বড়দা, আমি চললাম। চিত্তপ্রিয় মৃত্যুপথযাত্রী একফোঁটা জলের জন্য ছটফট করছিল। এদিকে বাঘা যতীন গায়েও গুলি লেগেছিল। কিন্তু তার শেষ পর্যন্ত লড়াই করার কথা, চিত্তপ্রিয়কে জল খাওয়ানোর জন্য নিজের পরনে রক্তমাখা সাদা শার্ট উড়িয়ে যুদ্ধ বিরতির সংকেত দিলেন ও আত্মসমর্পণ করেন। ইংরেজ সাহেব কাছে এলেন, বাঘা যতীন দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন - শুধু এর মুখে এক ফোঁটা জল দেবার জন্য আমি যুদ্ধ বন্ধ করে ধরা দিচ্ছি। কিছুক্ষণ পরেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তরুণ কিশোর চিত্তপ্রিয়। দিনটি ছিল ৯ই সেপ্টেম্বর ১৯১৫ সাল। বুড়িবালামের চাসখন্ডে মারা গেলেন চিত্তপ্রিয়। এই বীরের কথা কজনেই জানে, প্রণাম জানাই বীর কিশোর মৃত্যুঞ্জয়ী চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরীর চরণও তলে।
(তথ্যসূত্র, ক্ষমা নেই দেশদ্রোহী প্রথম খণ্ড)
— লেখায়: প্রকাশ রায়


0 মন্তব্যসমূহ