স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কত অজানা নাম যে আলো ছড়িয়ে আছে, আমরা অনেকেই আজ তা জানি না। যাদের অটল সাহস আর ত্যাগের বিনিময়ে এই মাতৃভূমি মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল—তাদেরই একজন নীরব, বিনম্র অথচ দৃপ্ত সংগ্রামী ছিলেন মহেন্দ্রনাথ রায়।
![]() |
| মহেন্দ্রনাথ রায় |
প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন এক সাধারণ বিদ্যালয়ের ব্যায়াম শিক্ষক। কিন্তু মনে ছিল অগ্নিশিখার মতো দেশমুক্তির স্বপ্ন। খুব দ্রুতই তিনি বিপ্লবী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠেন। মেছুয়াবাজার বোমা মামলায় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলার সূত্র ধরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়; বিচারে কয়েক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডও হয়। তবুও থেমে যাননি তিনি—আপিলে মুক্তি পেলেও মুক্ত বাতাসে ফিরে এসে আবার জ্বলে উঠেছিল তাঁর বিপ্লবী চেতনা।
১৯৩০ সাল। দেশজুড়ে তখন আন্দোলনের আগুন। ঠিক সেই সময় আবার ধরা পড়েন মহেন্দ্রনাথ রায়। এইবার তাকে পাঠানো হয় রাজস্থানের দেউলি বন্দী-শিবিরে। সেখানে তাঁকে সহ্য করতে হয় অমানুষিক অত্যাচার—যন্ত্রণার সেই রাতগুলোতে হয়তো শরীর ভেঙে গিয়েছিল, কিন্তু মন ভাঙেনি তাঁর। নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে পাঠানো হয় জেল-হাসপাতালে। স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে নিয়েই কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। ১৯৩০ সালের সেই নিঃশব্দ বিদায়ের দিনটি হয়ে রইল এক অদেখা, অশ্রু-ঢাকা ইতিহাসের অধ্যায়।
মেছুয়াবাজার বোমা মামলায় কেবল তিনিই নন, বিপ্লবী নিরঞ্জন সেনগুপ্ত, সতীশচন্দ্র পাকড়াশী, রবীন্দ্রনাথ বসু, সুবোধ চক্রবর্তীসহ আরও অনেক তরুণকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ১৯১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। কারো সাত বছরের, কারো পাঁচ বছরের কারাদণ্ড—সবাই মিলে তারা ছিল স্বাধীনতার অগ্নিযুগের দুর্দান্ত সন্তান।
বইয়ের পাতায় সম্ভবত তাদের নাম সেভাবে জায়গা পায়নি, কিন্তু ইতিহাসের মাটিতে, মাটির গভীরে—তাদের রক্ত, তাদের ত্যাগ চিরকাল জ্বলজ্বল করে আছে। আর সেই আলোতেই আজও আমরা মাথা উঁচু করে বলতে পারি—এই দেশ, এই স্বাধীনতা, সাহসীদেরই রক্তমাখা উপহার।
— লেখায়: প্রকাশ রায়

0 মন্তব্যসমূহ