গেন্দালাল দীক্ষিত—একটি নাম, যেটি উচ্চারণ করতেই চোখে জল চিকচিক করে ওঠে আর হৃদয়ে গর্বের বিস্ফোরণ ঘটে। এমন এক দুর্দান্ত বিপ্লবী, যিনি নিজের সাহসিকতা দিয়ে ইংরেজ শাসকদের কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি শুধু ছাত্র-যুবকদেরই নয়, চম্বলের ভয়ংকর দস্যু-সর্দারদের মধ্যেও দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে তাদের জীবনকে স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ করতে শপথবদ্ধ করেছিলেন। যিনি নিজের ত্যাগ, বুদ্ধি এবং বীরত্ব দিয়ে উত্তর ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবে নয়া দিশা এনে দিয়েছিলেন—তিনি হলেন পণ্ডিত গেন্দালাল দীক্ষিত।
![]() |
| পণ্ডিত গেন্দালাল দীক্ষিত |
৩০ নভেম্বর ১৮৮৮ সালে উত্তর প্রদেশের আগ্রা জেলার বাহ তহসিলের ময় গ্রামে জন্ম নেয় এই অদম্য শিশুটি। মাত্র তিন বছর বয়সে মাকে হারালেও তাঁর হৃদয়ের সাহস কখনো হারায়নি। মায়ের ছায়া ছাড়া বড় হতে হতে তাঁর ভিতরে জন্ম নেয় এক অসাধারণ বীরত্ব, এক আগুনের মতো জেদ, যা তাঁকে সাধারণ মানুষের ভিড় থেকে আলাদা করে তোলে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ এবং স্বদেশি আন্দোলনের ঢেউ তাঁর মনে যে বিপ্লবের আলো জ্বালিয়ে দেয়, তা তাঁকে আজীবনের জন্য মাতৃভূমির পথের যোদ্ধা বানিয়ে দেয়।
তিনি এমন ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন যে দস্যুরাও তাঁর সামনে মাথা নত করত। যাদের হাতে অস্ত্র ছিল ভয়ের জন্য—তাঁর কথায় সেই অস্ত্র আজাদির জন্য উঠল। তিনি তৈরী করলেন ‘শিবাজী কমিটি’, ছাপামার যুদ্ধের কৌশল রপ্ত করিয়ে গোপনে ইংরেজদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেন। ১৯১৬ সালে চম্বলের বিহাড়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন ‘মাতৃবেদী’ দল—যেখানে পরে যোগ দিলেন কিংবদন্তি বিপ্লবী রামপ্রসাদ ‘বিস্মিল’, দেবনারায়ণ ভারতীয়, কৃষ্ণ দত্ত পালীওয়াল, ব্রহ্মচারী লক্ষ্মণানন্দ, শিবচরণ লাল শর্মা এবং সরদার পঞ্চম সিং। একসময় এই দলের কাছে ছিল দুই হাজার পায়ে হেঁটে চলা সেনা এবং পাঁচশো ঘোড়সওয়ার—সবাই মৃত্যুকে তুচ্ছ করে স্বাধীনতার জন্য লড়তে প্রস্তুত।
কিন্তু বিপ্লবের পথ কখনো সরল হয় না। এক রাতে ৮০ জন বিপ্লবীর দল জঙ্গলে বিশ্রাম নিচ্ছিল। তখনই এক বিশ্বাসঘাতক সঙ্গী পুলিশকে খবর দেয়। ৫০০ পুলিশ জঙ্গল ঘিরে ফেলে। বিপ্লবীরা তখন অত্যন্ত ক্ষুধার্ত। সুযোগ বুঝে সেই বিশ্বাসঘাতক খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়। খেতেই কয়েকজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সে পালাতে গেলে ব্রহ্মচারীজি গুলি করেন, আর সেই আওয়াজে ইংরেজ পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভয়ংকর সংঘর্ষে ৩৫ জন বিপ্লবী মারা যান, বাকিরা ধরা পড়েন। পরে বিচারকালে সরকারি সাক্ষী সোমদেব পণ্ডিত গেন্দালাল দীক্ষিতকে পুরো আন্দোলনের প্রধান বলে সনাক্ত করেন।
ময়ানপুরীর হিরাসতে থাকা অবস্থায় তাঁর সহযোদ্ধা দেবনারায়ণ ভারতীয় ফলের ঝুড়িতে লুকিয়ে রিভলভার ও লোহার আড়ি পাঠালে দীক্ষিতজি রাতের অন্ধকারে শিকল কেটে পালিয়ে যান, সঙ্গে করে পালিয়ে যান সরকারি সাক্ষী রামনারায়ণকেও।
পালিয়ে তিনি প্রথমে কোটা গেলেও সেখানেও খোঁজ চলছিল। বাড়িতে ফিরলে পরিবার ভয় পেয়ে বলে—“এখান থেকে চলে যান, না হলে পুলিশ ডাকবো।” কতটা ব্যথা! যে মানুষ দেশকে মুক্ত করতে নিজের জীবন উজাড় করলেন, নিজের বাড়িই তাকে আশ্রয় দিতে ভয় পেল!
দিন-রাত নিরবচ্ছিন্ন পালিয়ে থাকা, ক্ষুধা, অসুস্থতা—সব মিলিয়ে তাঁর দেহ ভেঙে পড়ে। তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন, দশ পা হাঁটলেই অজ্ঞান হয়ে যেতেন। তবুও লড়াই থামাননি।
শেষমেশ দিল্লি গিয়ে জীবিকার জন্য একটি জল পান করানোর কাজ নেন। শরীর যখন আর চলছিল না, তখন তাঁকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেই নির্জন হাসপাতালের শয্যায়, সাদা দেয়ালের মাঝে, কেবল মাত্র মাতৃভূমিকে স্মরণ করতে করতে—২১ ডিসেম্বর ১৯২০ সালে এই মহাবীর পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
যে মানুষটির ইচ্ছে ছিল দেশের জন্য গুলিতে মরতে—তার মৃত্যু হলো হাসপাতালে নিঃশব্দে। না ছিল তিরঙ্গা, না ছিল স্যালুট, না ছিল মানুষের ভিড়—তবু আজ তাঁর জীবনকথা পড়লেই বুকের ভেতর কেমন যেন একটা চাপা কাঁপুনি ওঠে, আর চোখের কোনা ভিজে আসে। কারণ তিনি কিছুই চাননি—না নাম, না যশ—তিনি শুধু স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। আর আজ আমরা যে স্বাধীন ভারত দেখি, তা এই অমর সন্তানদের রক্তের ঋণে পাওয়া।
পণ্ডিত গেন্দালাল দীক্ষিত—ভারত তোমাকে কখনো ভুলবে না।
— লেখায়: প্রকাশ রায়

0 মন্তব্যসমূহ