লালা লাজপত রায়

ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যাদের সাহস, ত্যাগ আর দেশপ্রেম আজও হৃদয় কাঁপিয়ে তোলে। পাঞ্জাবের মাটি থেকে উঠে আসা এক নির্ভীক যোদ্ধা ছিলেন তিনি—যার কণ্ঠে ছিল আগুন, যার ইচ্ছাশক্তিতে ছিল বজ্রের দৃঢ়তা, আর যার পদক্ষেপে ছিল জাতিকে জাগানোর শক্তি। তিনি শুধু সংগ্রামী নন, তিনি ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা, ছিলেন নেতৃত্বের আলোকবর্তিকা… লালা লাজপত রায়

১৮৬৫ সালের ২৮ জানুয়ারি পাঞ্জাবের জন্মসূত্রে এ দেশভাগ্যবান মানুষটির শৈশব থেকেই দেশকে নিয়ে ছিল গভীর মমত্ববোধ। পিতা মুন্সি রাধাকৃষ্ণ আজাদের মানবিকতা ও ন্যায়বোধ তাঁর চরিত্রকে আরও উদার করে তোলে। জীবনের কিছু সময় তিনি রোহতক ও হিসার শহরে আইনচর্চা করলেও তাঁর হৃদয় আটকে ছিল দেশের মানুষের সেবায়। তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতা নন—জনতার স্বার্থে নিবেদিত এক অকৃপণ কর্মী। তিনি “পাঞ্জাব কেশরি” নামে পরিচিত হয়েছিলেন তাঁর অগ্নিঝরা বক্তব্য, নিঃস্বার্থ দেশসেবা ও আপসহীন আদর্শের জন্য।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চরমপন্থী গোষ্ঠীর নেতৃত্বে বাল গঙ্গাধর তিলক ও বিপিন চন্দ্র পালের সঙ্গে মিলে তৈরি হয় কিংবদন্তি ত্রয়ী—লাল-বাল- পাল। এই তিন নেতারাই প্রথম উচ্চারণ করেন ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি। আর্য সমাজের আদর্শকে পাঞ্জাবে জনপ্রিয় করা, দুর্ভিক্ষে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বহু স্থানে ত্রাণশিবির গড়ে তোলা—সবই তাঁর অটল সেবাময় চরিত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক ও লক্ষ্মী বিমা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে ভারতের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তিও রচনা করেন।
১৯২৮ সালের ৩০ অক্টোবর সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে হওয়া প্রতিবাদ মিছিলে তিনি অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেন। সেই দিন ইতিহাস নির্মম হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ পুলিশের নৃশংস লাঠিচার্জে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন। কিন্তু মৃত্যুশয্যাতেও তাঁর কণ্ঠে ছিল না কোনো ভয়, ছিল না কোনো দুর্বলতা। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন— “আমার শরীরের ওপর ব্রিটিশের প্রতিটি আঘাত ব্রিটিশ রাজের পতনের ঘণ্টাধ্বনি হয়ে উঠবে।”
১৭ নভেম্বর ১৯২৮—সেই নির্মম দিন। দেশের আরেকটি আলো নিভে যায়, কিন্তু তাঁর নিঃশেষিত নিশ্বাস জ্বালিয়ে দেয় নতুন আগুন। সমগ্র দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, রাজগুরু, সুখদেবসহ অসংখ্য বিপ্লবী লালাজির মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেন। ঠিক এক মাস পর, ১৭ ডিসেম্বর, ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার সন্ডার্সকে হত্যা করে তারা প্রতিশোধের শিখা জ্বালিয়ে দেন। এই ঘটনার পর ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রামে দেখা যায় এক নতুন গতি, নতুন আলো, নতুন উত্তাপ।
লালা লাজপত রায়ের মৃত্যু শুধু একটি মানুষকে হারানো ছিল না, ছিল এক যুগবদ্ধ আগুনের বিস্ফোরণ—যা ভারতীয় আন্দোলনকে আরও তীব্র, আরও দৃঢ়, আরও অপরাজেয় করে তোলে। তাঁর জীবন ছিল সেবা, সাহস, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার এক মধুর অথচ তীব্র সুর, যা ভারতের আত্মাকে আজও আলোড়িত করে।
— লেখায় : প্রকাশ রায়

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ