অগ্নিযুগের নির্ভীক বিপ্লবী বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি

স্বাধীনতার সূর্য তখনও দিগন্তে ওঠেনি, তবু বাংলার আকাশে জ্বলছিল বিদ্রোহের মশাল। ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচারে যখন দেশবাসীর বুক রক্তে রাঙা, তখন এক তরুণ নিজের জীবনকে বাজি রেখে নামলেন লড়াইয়ে—তিনি ছিলেন সেই সময়ের আগুনের মানুষ, বিপ্লবের সাহসী সৈনিক বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি।

১৮৮৭ সালের ৫ নভেম্বর, উত্তর চব্বিশ পরগনার হালিশহরে জন্ম তাঁর। ছোটবেলা থেকেই স্বাধীনতার অমোঘ আকর্ষণে তিনি জড়িয়ে পড়েন স্বদেশী আন্দোলনে। আত্মোন্নতি সমিতির সদস্য হিসেবে বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি বিপ্লবী আদর্শে দীক্ষিত হন, পরে যুগান্তর দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত হন। বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও রাসবিহারী বসুর সহকর্মী রূপে তাঁর সাহসিকতা ও পরিকল্পনাশক্তি ছিল অসাধারণ।
১৯১৪ সালে তাঁর নেতৃত্বেই সংঘটিত হয় ইতিহাসখ্যাত রডা কোম্পানির অস্ত্র অপহরণ—যে অভিযান বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়। এরপর ১৯১৫ সালে তিনি বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখার্জির সঙ্গে অংশ নেন বার্ড কোম্পানির গাড়ি অপহরণ অভিযানে। এই সাহসিক কার্যকলাপ তাঁকে ব্রিটিশ প্রশাসনের চোখে “অত্যন্ত বিপজ্জনক বিপ্লবী” করে তোলে।
কিন্তু বিপ্লবের আগুন তাঁর মধ্যে কখনো নিভে যায়নি। ১৯২১ সালে তিনি কংগ্রেস আন্দোলনে যোগ দেন, এবং ১৯৩০ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও তাঁর গর্জন শোনা যায়। ব্রিটিশরা বারবার তাঁকে বন্দি করেছে—তবুও সংগ্রামের পথ থেকে সরাতে পারেনি। জীবনের প্রায় ২৪ বছর তিনি কাটিয়েছেন ভারতের বিভিন্ন কারাগারে।
স্বাধীনতার পরও তাঁর পথ থেমে যায়নি। শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে তিনি নিজেকে যুক্ত করেন এবং ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দেন। ১৯৫২ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তিনি বীজপুর কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য হন—বন্দিশালার এক বিপ্লবী থেকে গণতন্ত্রের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন তিনি।
১৪ জানুয়ারি ১৯৫৪ সালে ইতিহাসের মঞ্চ থেকে চিরবিদায় নেন এই মহান যোদ্ধা। তবু তাঁর নাম আজও প্রতিধ্বনিত হয় প্রতিটি মুক্তিকামী হৃদয়ে—যিনি বিপ্লবের আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে স্বাধীনতার আলো জ্বালিয়েছিলেন, সেই বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি।
— লেখায় : প্রকাশ রায়

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ