ভারতের প্রথম সশস্ত্র বিপ্লবী – বাসুদেব বলবন্ত ফড়কে

অন্ধকারে ডুবে থাকা ঔপনিবেশিক ভারতের বুক চিরে যখন এক তরুণের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো স্বাধীনতার মন্ত্র, তখন ইতিহাস জানল— দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার আগুন একাই জ্বালিয়ে দিতে পারে একজন মানুষ। সেই আগুনের নাম — বাসুদেব বলবন্ত ফড়কে!

মহারাষ্ট্রের বুকে যে বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্র ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই বিপ্লবের মহান অধিনায়ক বিপ্লবী হলেন বাসুদেব বলবন্ত ফড়কে। পরাধীনতার শৃঙ্খলে জর্জরিত দেশ, ইংরেজদের অত্যাচারে কাঁপছে মহারাষ্ট্র— অনাহার, দারিদ্র্য ও হতাশায় জর্জরিত গ্রামাঞ্চল যেন নিঃশ্বাসহীন। মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ একদিন বিস্ফোরিত হলো বিদ্রোহে। তখনই আবির্ভাব ঘটে এই তরুণ বিপ্লবীর, যার চোখে ছিল অগ্নিশিখা আর মনে ছিল স্বাধীনতার অমোঘ ডাক।

মহারাষ্ট্রের সামরিক অর্থ দপ্তরের একজন কর্মচারী ছিলেন ফড়কে। ৪ নভেম্বর ১৮৪৫ সালে, চিৎপাবন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই তরুণ তাঁর জীবনের লক্ষ্য স্থির করেছিলেন— “দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতেই হবে।” তিনি শিবাজী মহারাজের সমরকৌশল ও ন্যায়নীতিকে আদর্শ করে গড়ে তুলেছিলেন তরুণদের বিপ্লবী বাহিনী।
দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে আনতে হবে ইংরেজদের কাছ থেকে— এই বিশ্বাসে তিনি গোপনে প্রচার শুরু করলেন। তরুণদের সংগঠিত করে তৈরি করলেন এক সাহসী সৈন্যদল, যাদের মূলমন্ত্র ছিল “ভক্তি ও শক্তি”— দেশের প্রতি ভক্তি, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তি। ১৮৭৯ সালে এই বাহিনী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে মহারাষ্ট্র কাঁপিয়ে দেয়। ইংরেজ অফিসাররা তাঁদের কর্মকাণ্ডকে “রাজনৈতিক ডাকাতি” বলে দাগিয়ে দিলেও, জনতা তাঁদের দেখেছিল মুক্তির দূত হিসেবে।
বোম্বাইয়ের গভর্নর রিচার্ড টেম্পলকে হত্যা করার জন্য ফড়কে পাঁচশো টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেন— যা ইংরেজদের হৃদয়ে ভয় সৃষ্টি করে। ফড়কের নেতৃত্বে এই বাহিনী ব্রিটিশ প্রশাসনের ঘুম উড়িয়ে দেয়, আর মহারাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ তাঁকে সসম্মানে “দ্বিতীয় শিবাজী” বলে সম্বোধন করতে শুরু করে।
১৮৭৯ সালের ৩ জুলাই, হায়দ্রাবাদের কলাদগির মন্দিরে তাঁকে বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে গ্রেফতার করা হয়। বিচারে তাঁর আজীবন কারাদণ্ড হয়, এবং তাঁকে পাঠানো হয় সুদূর অ্যাডেন বন্দরের নির্জন কারাগারে। সেখানে অকথ্য নির্যাতন, অনাহার ও একাকিত্বেও তিনি ভাঙেননি। তাঁর সমস্ত জীবন নিবেদিত ছিল মাতৃভূমির তপস্যায়। অবশেষে ১৮৮৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, অ্যাডেন কারাগারের অন্ধকার কক্ষে তিনি চিরনিদ্রায় যান। কিন্তু তাঁর রক্তে লেখা বিদ্রোহের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতে।
বাসুদেব বলবন্ত ফড়কে ছিলেন ভারতের প্রথম সশস্ত্র বিপ্লবী, যিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত যুদ্ধের সূচনা করেন। তাঁর স্বপ্ন ও ত্যাগ পরবর্তীকালে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল চাপেকার ভ্রাতৃদ্বয়, ভগত সিং, সাভারকর প্রমুখ বিপ্লবীদের।
আজও ইতিহাসের পৃষ্ঠা খুললেই শোনা যায় সেই অগ্নিধ্বনি— “যে বীজ এক ফড়কে রোপণ করেছিলেন, তা-ই একদিন জন্ম দিয়েছিল স্বাধীন ভারতের বৃক্ষ!”
— লেখক: প্রকাশ রায়

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ