ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসকদের অত্যাচার-অবিচারে ক্ষুব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল এক সাহসী যুবক। নিজের আদিবাসী মুন্ডা সমাজকে সংগঠিত করে তিনি শুরু করেছিলেন এমন এক বিদ্রোহ, যা কেবল অস্ত্রের নয়—অধিকার, আত্মমসম্মান আর মাটির গন্ধে ভেজা বেঁচে থাকার লড়াই। তাঁর অনুপ্রেরণা, তাঁর আগুনের মতো হৃদয়, তাঁর পথচলা আজও হাজার মানুষের মন ছুঁয়ে যায়—আর সেই আলোর উৎস বিরসা মুন্ডা।
১৮৭৫ সালের ১৫ই নভেম্বর, বৃহস্পতিবার, বর্তমান ঝাড়খণ্ডের রাঁচি জেলার উলিহাটু গ্রামে জন্মেছিলেন তিনি। বাবা সুগানা মুন্ডা, মা করমি মুন্ডার স্নেহে বেড়ে ওঠা এই শিশুর নাম রাখা হয়েছিল জন্ম-বারের নামে—বিরসা। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল নেতৃত্বের দীপ্তি, আর মাটির মানুষের জন্য জন্মগত প্রেম।
১৮৯৫ সালের দিকে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে বিরসা বুঝলেন—চুপ করে থাকলে চলবে না। মুন্ডাদের কুসংস্কার ও অবহেলার চক্র ভেঙে নতুন শক্তি গড়তে হবে। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে জাগানো শুরু করলেন। বললেন, “আমি বিরসা নই, আমি ধরতি আবা… মুন্ডাদের মরতে ও মারতে শেখাবো।” খবর পৌঁছালো রাঁচির ডেপুটি কমিশনারের কাছে। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলো—দুই বছরের কারাদণ্ড।
১৮৯৭ সালের ৩০শে নভেম্বর হাজারীবাগ জেল থেকে বেরিয়েই তিনি আবার জেগে উঠলেন আরও তীব্র শক্তিতে। মুন্ডারা দায়িত্ব নিল, সভা হলো পাহাড়ে-জঙ্গলে—ডোম্বারি পাহাড়ে টানা বহু মাস ধরে চলল বিদ্রোহের প্রস্তুতি। লাল নিশান উঁচিয়ে বিরসা বললেন—“দিকুদের সঙ্গে যুদ্ধ হবে। এই নিশানের মতো লাল রক্ত বইবে মাটিতে।”
১৮৯৯ সালের বড়দিনে আঘাত করে বিদ্রোহীরা। রাঁচি, সিংভূম, তামাড়—ইংরেজদের ঘাঁটিতে তীরের ঝড়। ব্রিটিশদের মাথার টনক নড়ে গেল। অভিযান চলল পাহাড়ে, জঙ্গলে, ঘিরে ফেলা হলো অঞ্চল। মুন্ডারা বীরের মতো প্রতিরোধ করলো, কিন্তু শক্তিশালী ব্রিটিশ বাহিনী শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে বিরসাকে গ্রেপ্তার করে।
১৯০০ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি তাকে ধরা হয়। বিচারের নামে চলল অন্যায় নাটক—ফাঁসির আদেশ, দ্বীপান্তর, দীর্ঘ কারাবাস। বিরসা মুন্ডাকে জেলের ভিতরে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল বলে বহু অভিজ্ঞ ডাক্তারদের মত—যদিও সরকারি ভাষ্যে বলা হয় কলেরা। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৯০০ সালের ৯ই জুন।
তবুও মৃত্যু তাঁকে শেষ করতে পারেনি। আদিবাসী সমাজ তাঁকে আজও “বিরসা ভগবান” বলে ডাকে। তিনি শিখিয়ে গেছেন—অধিকার না দিলে ছিনিয়ে নিতে হয়, মাটির মানুষকে মানুষ করতেই হয়, আর স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনে জীবন দিয়ে দিতেও হয়।
— লেখায় : প্রকাশ রায়

0 মন্তব্যসমূহ