নগেন্দ্রনাথ দত্ত : পূর্ববঙ্গের অগ্নিশিখা বিপ্লবের এক নির্ভীক সৈনিক

সেই সময় ভারতজুড়ে দাউ দাউ করে জ্বলছে স্বাধীনতার আগুন। দেশমাতৃকার মুক্তির ডাক কানে বাজলেই কিশোর হৃদয়েও ঝড় ওঠে। এমনই অদম্য সাহস আর অটল সংকল্প নিয়ে ইতিহাসের মাটি থেকে উঠে এসেছিলেন ভোজপুর-শ্রীহট্টের এক নির্ভীক যুবক—যিনি ‘গিরিজা বাবু’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন বিপ্লবীদের গোপন জগতে। বাল্যবয়সেই বন্দুকের শব্দ তার কাছে ছিল খেলনার মতো, আর ইংরেজদের অত্যাচার ছিল তাঁর ধমনীতে আগুন ছড়ানো চ্যালেঞ্জ। প্রথম স্তবক শেষ হতে না হতেই পাঠক বুঝে গেছেন হয়তো—এই গল্প এক মহাবিপ্লবীর, এই গল্প নগেন্দ্রনাথ দত্তের।

নগেন্দ্রনাথ দত্ত
 নগেন্দ্রনাথ দত্ত

১৮৯৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা গোবিন্দচন্দ্র দত্ত ছিলেন সুনামগঞ্জের নামজাদা উকিল—বুদ্ধি, শৃঙ্খলা আর দেশপ্রেমের মিশেলে যাঁর কাছে ছেলের মনে জেগেছিল বিদ্রোহের বীজ। ছোটবেলায় ব্রিটিশদের কাজকর্ম তাকে আকৃষ্ট করলেও, শীঘ্রই সেই আকর্ষণ পরিণত হয় প্রতিরোধে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে পিতার কাছেই শেখেন বন্দুক চালানো; সাহস তখন এমন পর্যায়ে যে একদিন বন্ধুদের সঙ্গে রিভলভার চালানোর অনুশীলনে নিজের উরুতেই লাগে গুলি—রক্ত ঝরে, ব্যথা ওঠে, কিন্তু মনোবল একটুও টলে না। সুনামগঞ্জে আইন পড়তে পড়তেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে। পরে অনুশীলন সমিতিতে যোগ দিয়ে নিজের গ্রামেই প্রতিষ্ঠা করেন আলাদা শাখা—যেন এক কিশোর জেগে উঠেছে দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রহরী হয়ে।

১৯০৮ সালে পুলিন দাস গ্রেপ্তার হয়ে দণ্ডিত হলে অনুশীলন সমিতির দায়িত্ব আরও ভর করেন নগেন্দ্রনাথের কাঁধে। তিনি হয়ে ওঠেন প্রধান কার্যকর্তাদের একজন। স্বদেশী আন্দোলনকে তীব্র করার জন্য তিনি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বদেশী ডাকাতির পথ বেছে নেন—ইংরেজি শোষণের বিরুদ্ধেই ছিল এই প্রতিশোধের শপথ। বিশ্বাসঘাতকদের শাস্তি দেওয়া, সংগঠন বিস্তার এবং বিপ্লবীদের রক্ষা ছিল তার নিরলস কাজ। মহান বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। রাসবিহারী বসুর নেতৃত্বে তিনি উত্তর ভারতজুড়ে বিপ্লবী সংগঠন জোরদার করতেন। পরে বসু দেশত্যাগ করলে সংগঠন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়—কিন্তু নগেন্দ্রনাথ তখন সিংহহৃদয় নিয়ে বিপ্লবীদের একত্র করার লড়াই চালিয়ে যান প্রাণপণে।
১৯১৫ সালে তিনি বেনারস ষড়যন্ত্রে সক্রিয় ভূমিকা নেন—যা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম দুর্ধর্ষ অধ্যায়। এই ষড়যন্ত্রের সূত্র ধরে সেই বছরই ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেপ্তার করে তাকে। বিচার শেষ হতে না হতেই শুনতে হয় নির্মম রায়—যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু শৃঙ্খল তাঁকে বেঁধে রাখতে পারেনি। চার বছর কারাগারে যে অমানবিক নির্যাতন চলে, তার প্রতিবাদে তিনি অন্নজল ত্যাগ করেন—শরীর ক্ষয়ে যেতে থাকে, অথচ মনোবল থাকে অটুট। আগ্রা জেলের নোংরা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে তিনি আক্রান্ত হন আমাশয় রোগে। চিকিৎসার নাম করে যে সামান্য যত্ন দেওয়ার কথা, তা পর্যন্ত পাননি—যেন মৃত্যুকেই তাঁকে ধীরে ধীরে টেনে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
অবশেষে, ১৯১৮ সালে মাত্র বিশের কোঠাতেই নিভে যায় এক উজ্জ্বল বিপ্লবীর জীবন। চিকিৎসার অভাবে, অবহেলার শৃঙ্খলে, অথচ বুকভরা দেশপ্রেমের উজ্জ্বল আলো জ্বেলে রেখে চলে যান নগেন্দ্রনাথ দত্ত। তাঁর মৃত্যু ছিল কষ্টের, কিন্তু তাতে লুকিয়ে ছিল এক অশেষ মাধুর্য—দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার গর্ব, স্বাধীনতার জন্য অটল ত্যাগ।
নগেন্দ্রনাথ দত্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে হয়তো ততটা আলোচিত নাম নন—কিন্তু তিনি যে আগুন জ্বালিয়েছিলেন, তা যুগে যুগে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তার বেদনা, তার মমতা, তার শপথ আর অদম্য সাহস আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়, শোনায় এক তরুণ বিপ্লবীর অমলিন প্রতিজ্ঞার গল্প।
— লেখায়: প্রকাশ রায়

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ