ভুলে যাওয়া এক বীর বিপ্লবী জ্যোতিষচন্দ্র পাল

ভারত মাকে ইংরেজদের শিকল থেকে মুক্ত করার স্বপ্নে যখন অগণিত তরুণ বুকের রক্ত ঢেলে দিচ্ছিলেন, তখন তাদেরই একজন ছিলেন বিপ্লবী জ্যোতিষচন্দ্র পাল — যাঁর নাম ইতিহাসের পাতায় আজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। প্রথম স্তরের শেষে যেন বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেয় সেই পরিচয় — জ্যোতিষচন্দ্র পাল
জ্যোতিষচন্দ্র পাল
জ্যোতিষচন্দ্র পাল

নদিয়া জেলার কমলাপুরে জন্ম তাঁর। পিতা মাধবচন্দ্র পাল। বাঘা যতীনের দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে তিনি ছিলেন নির্ভীক, অনমনীয়, অথচ খুব পরিচিত নন আজকের প্রজন্মের কাছে। তাঁর শৈশবের কথা, শিক্ষার কথা, সংসারের কথা ইতিহাস খুব বেশি সংরক্ষণ করে রাখেনি। কিন্তু বুড়ি বালামের তীরে সেই অসম যুদ্ধ তাঁকে চিরকালের জন্য আলাদা করে রেখেছে। ১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্বাধীনতার লড়াইয়ে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সংগ্রহের জন্য উড়িষ্যার বালেশ্বর উপকূলে জার্মান জাহাজ "ম্যাভেরিক" থেকে গোলাবারুদ আনতে তিনি নিজের জীবনকেই সমর্পণ করেছিলেন।

সেদিন গভীর রাতে বাঘা যতীন, চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত, নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত এবং জ্যোতিষচন্দ্র পাল— সকলেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পালাচ্ছেন। চারদিকে তল্লাশি, পথ রুদ্ধ। স্থানীয় মানুষ বিপ্লবীদের চেনেনা, ডাকাত ভেবে শত্রুতা করছে। নিঃস্তব্ধ রাত, কাঁপা অন্ধকার পেরিয়ে পাঁচজন ফিরে এলেন মহলডিহার সাময়িক আস্তানায়— ৭ই সেপ্টেম্বর, বিপন্ন এক ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে।

৮ই সেপ্টেম্বর কাটল গভীর জঙ্গলে। রাতভর নদী, খাল, বিল পেরিয়ে ৯ই সেপ্টেম্বর ভোরে পৌঁছলেন বালেশ্বরের বলরামগড়িতে বুড়িবালাম নদীর উপকূলে। ওদিকে খবর পৌঁছে গেছে থানায়। ইংরেজ বাহিনী ইতিমধ্যে দুই দিক দিয়ে ঘিরে ফেলেছে। শেষ আশ্রয়— নদী সাঁতরে ওপারে শুকনো এক ডোবার আড়াল। তারপর নেমে এল সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত।

বিপরীত দিকে চার্লস টেগার্ট, কম্যান্ডার রাদারফোর্ড, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিলভি আর অসংখ্য সশস্ত্র সৈন্য। আর এদিকে কেবল পাঁচজন বিপ্লবী, হাতে মাউজার পিস্তল। মনে হচ্ছিল মৃত্যুকেও যেন তারা তুচ্ছ করে দিয়েছে। শুরু হলো দুই দিক থেকে গুলিবর্ষণ। পাঁচজনের গুলির শব্দে মনে হচ্ছিল যেন একটা পুরো সেনাদল লড়াই করছে। হঠাৎ এক ঝাঁক গুলি এসে বিদ্ধ করল চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরীকে। বন্ধু জলে ছটফট করছে, চোখে নিভে যাচ্ছে আলো— তাই বাঘা যতীন আত্মসমর্পণ করলেন। স্বাধীনতার লড়াইয়ের ভাষা এইটাও— সঙ্গীর পিপাসা মেটাতে নিজের প্রাণ তুচ্ছ করা।

চিত্তপ্রিয় সেদিনই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। বাঘা যতীনও পরের দিন হাসপাতালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। বাকিদের গ্রেফতার করা হলো। ১৬ই অক্টোবর ১৯১৫— মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত এবং নীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত পেলেন প্রানদণ্ড। জ্যোতিষচন্দ্র পাল পেলেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

তারপর শুরু হলো আরেক অন্ধকার অধ্যায়। আন্দামানের সেলুলার জেলে তাঁকে কুঠরিতে আটকে রাখা হলো। অত্যাচার, নির্যাতন, একাকীত্ব— সব মিলিয়ে তাঁর মন আর শরীর দুটোই ভেঙে পড়তে লাগল। দিন-রাতের কোন ঠিক নেই, আলো-অন্ধকারের কোন সীমা নেই— শুধু কান্নাহীন এক দীর্ঘ তাড়না। ধীরে ধীরে তাঁর স্বাভাবিক জীবনবোধ হারিয়ে যেতে থাকল, নেমে এল মানসিক অস্থিরতা। পরে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো বহরমপুর উন্মাদ আশ্রমে। ১৯২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর এই অসাধারণ বিপ্লবীর জীবনাবসান ঘটে নীরব, অগোচরে।

আজ আমাদের স্বাধীনতার আকাশ যত উজ্জ্বল, তত ছায়া ফেলে হাজারো নামহীন দুঃখের গল্প। আমরা কতজন মনে রাখি এই নামটি? কতজন জানি তাঁর ত্যাগ, তাঁর নীরব যন্ত্রণার গল্প? ইতিহাস হয়তো তাঁর নামের পাশে স্বর্ণাক্ষরে কিছু লিখে রেখে যায়নি, কিন্তু আমাদের স্মৃতিতে তিনি চিরস্থায়ী হয়ে থাকবেন। কারণ দেশপ্রেমিক কখনও হারিয়ে যান না— তাঁরা শুধু অন্য হৃদয়ে নতুন করে জন্ম নেন।







একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ